শৈশব–কৈশোরের স্মৃতিতে ফিরে গিয়ে আপ্লুত শিক্ষকেরা

শৈশব–কৈশোরের স্মৃতিতে ফিরে গিয়ে আপ্লুত শিক্ষকেরা

তাঁরা নিজেরাও শিক্ষক। কিন্তু কিছুক্ষণের জন্য ফিরে গেলেন সেই ছাত্রজীবনে। স্মৃতি রোমন্থন করলেন সেই শৈশব-কৈশোরের আনন্দে ভরা দিনগুলোর। স্মৃতিচারণা করলেন প্রিয় শিক্ষকদের। আবেগে আপ্লুত হয়ে জানালেন স্কুলজীবনের দুষ্টুমি, শিক্ষকদের বকুনি আর ভালোবাসার কথা।

গতকাল সোমবার বিকেল সাড়ে চারটা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা পর্যন্ত সিলেট জেলা পরিষদ মিলনায়তনে মনোমুগ্ধকর এক সুধী সমাবেশে এসব স্মৃতিচারণা করেন শিক্ষকেরা। আর তা মুগ্ধ হয়ে শোনেন মিলনায়তন ভরা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়-কলেজ ও স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে সাহিত্য-সংস্কৃতি ও বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের প্রতিনিধিরা। প্রিয় শিক্ষক সম্মাননা ২০১৯ উপলক্ষে আয়োজন করা হয় এই সমাবেশ।

নির্ধারিত নিয়মে মনোনয়ন শেষে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের ১০ জন শিক্ষককে দেওয়া হবে ‘আইপিডিসি-প্রথম আলো প্রিয় শিক্ষক সম্মাননা’। আর এর অংশ হিসেবেই গতকাল আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইপিডিসি এবং প্রথম আলোর উদ্যোগে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। আগামী ৪ অক্টোবর নির্বাচিত প্রিয় শিক্ষকদের আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মাননা দেওয়া হবে। আড্ডা-গল্পে প্রত্যেকেই প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের কোনো না কোনো শিক্ষকের অবদানের কথা বলেন। আর সেসব শিক্ষককে সম্মাননা জানাতেই এ আয়োজন।

সিলেটে সুধী সমাবেশে প্রথম আলো ট্রাস্টের উদ্যোগে গড়া পদ্মাপাড়ের (রাজশাহীর চরখিদিরপুর) ‘আলোর পাঠশালা’ নিয়ে তৈরি করা একটি প্রামাণ্যচিত্র দেখানো হয়। প্রদর্শিত হয় ‘উচ্ছ্বাস’ শীর্ষক আইপিডিসির একটি প্রামাণ্যচিত্রও। শিক্ষক সম্মাননা নিয়ে নির্মিত একটি প্রামাণ্যচিত্রও প্রদর্শিত হয়।

অনুষ্ঠানে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শতাধিক শিক্ষক উপস্থিত ছিলেন। স্মৃতিচারণাকারী শিক্ষকদের মধ্যে রয়েছেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আব্দুল আউয়াল বিশ্বাস, বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ মো. ফয়জুল হক, দ্য এইডেড হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক মো. শমসের আলী প্রমুখ।

সবাই ফিরে গেলেন শৈশবের স্কুলে

সবাই ফিরে গেলেন শৈশবের স্কুলে

‘এক বিকেলে গভীর মনোযোগের সাথে ক্রিকেট খেলছি। হঠাৎ পেছন থেকে মহিউদ্দিন খান স্যারের বাজখাঁই গলায় চমকে উঠলাম। “ফাজিলের ফাজিল, একটু আগে তোর এসএসসি পরীক্ষার রেজাল্ট দিয়েছে। স্যাররা সবাই স্কুলে অপেক্ষা করছেন আর তুই এখানে জাভেদ মিয়াদাঁদ ফলাচ্ছিস।” স্যার বিদ্যুৎ বেগে আমাকে কোলে তুলে নিয়ে স্কুলের দিকে দৌড়াতে লাগলেন। স্যারের চোখে আনন্দ অশ্রু।’

স্কুলজীবনের প্রিয় শিক্ষক মহিউদ্দিন খানের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে একপর্যায়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন চট্টগ্রামের কর কমিশনার সৈয়দ মোহাম্মদ আবু দাউদ। যিনি এসএসসি পরীক্ষায় মানবিক বিভাগে পঞ্চম হয়েছিলেন। অথচ অষ্টম শ্রেণিতে প্রায় ফেল করতে বসে ছিলেন তিনি। কৃতিত্বপূর্ণ এই অর্জনের পেছনে স্কুলশিক্ষকদের ভূমিকার কথা যখন বর্ণনা করছিলেন মিলনায়তনভর্তি দর্শকদের চোখ তখন টলমল।

গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ছয়টা থেকে সাড়ে সাতটা পর্যন্ত চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের বঙ্গবন্ধু মিলনায়তনে ‘আইপিডিসি–প্রথম আলো প্রিয় শিক্ষক সম্মাননা ২০১৯’ উপলক্ষে সুধী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এতে উপস্থিত শিক্ষক-শিক্ষার্থী, শিল্পপতি-পেশাজীবী—শরতের স্নিগ্ধ সন্ধ্যায় সবাই যেন ফিরে যান ছাত্রজীবনে।

জীবনের লক্ষ্য কিংবা গতিপথ পাল্টে দেওয়ায় শিক্ষকদের স্মরণ করেন বিভিন্ন ক্ষেত্রে সফল ব্যক্তিরা। প্রিয় শিক্ষকদের অবদানের কথা বলতে গিয়ে কারও চোখে ছিল জল, কেউ হয়ে পড়েন স্মৃতিকাতর। কথামালায় বারবার ফিরে এসেছে শিক্ষকদের ‘বেতের বাড়ি’ কিংবা ‘বকাঝকা’। শিক্ষকদের সেই শাসনের আড়ালে লুকিয়ে থাকা স্নেহ আর ভালোবাসা এখনো ভুলতে পারেননি তাঁরা।

শিক্ষককে সম্মান না জানালে জাতি এগোতে পারবে না

শিক্ষককে সম্মান না জানালে জাতি এগোতে পারবে না

‘আমাদের আক্ষেপ তৈরি হয়েছে। শিক্ষার্থী-শিক্ষক সম্পর্ক আগের মতো নেই। অথচ শিক্ষার্থীর জীবন গঠনে বড় ভূমিকা পালন করতে পারেন একজন শিক্ষকই। আমরা হতাশার মধ্যে আছি। তবে শেষ হয়ে যাইনি। ভালো বিষয়ও আছে। ভালো চিন্তার মানুষও রয়েছে। শিক্ষকদের ভালোবাসার প্ল্যাটফর্ম রয়েছে। এ ছাড়া যদি শিক্ষকদের সম্মাননা দেওয়া হয়, তবে তা অসাধারণ হয়। স্কুলের শিক্ষককে যদি সম্মাননা দেওয়া যেত, অসম্ভব ভালো হতো। কারণ, শিক্ষককে সম্মান না জানালে জাতি এগোতে পারেব না।’

গতকাল বুধবার বিকেল পাঁচটা থেকে সন্ধ্যা পৌনে সাতটা পর্যন্ত বগুড়ার শহীদ টিটু মিলনায়তনে সুধী সমাবেশে এসব কথা বলেন শিক্ষকেরা। তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন বগুড়ার সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরাও। তাঁদের বক্তব্য আর স্মৃতিচারণা মুগ্ধ হয়ে শোনেন মিলনায়তনভর্তি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। দর্শক-শ্রোতার মধ্যে আরও ছিলেন সাহিত্য-সংস্কৃতি ও বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের প্রতিনিধিরা। প্রিয় শিক্ষক সম্মাননা ২০১৯ উপলক্ষে আয়োজন করা হয় এ সমাবেশের। জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু হয়। সংগীত পরিবেশন করেন উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী বগুড়া জেলা সংসদের সদস্যরা।

নির্ধারিত নিয়মে মনোনয়ন শেষে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের ১০ জন শিক্ষককে দেওয়া হবে ‘আইপিডিসি-প্রথম আলো প্রিয় শিক্ষক সম্মাননা’। আর এর অংশ হিসেবেই গতকাল আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইপিডিসি ও প্রথম আলোর উদ্যোগে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। আগামী ৪ অক্টোবর নির্বাচিত প্রিয় শিক্ষকদের আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মাননা দেওয়া হবে। স্মৃতিচারণায় অন্তত ১০ জন বক্তা তাঁদের শিক্ষাজীবনে শিক্ষকের অবদানের কথা তুলে ধরেন। কেউ বলেন তাঁর জীবন গঠনে শিক্ষকদের ভূমিকার কথা। আর সেসব শিক্ষককে সম্মাননা জানাতেই এ আয়োজন।

বগুড়ার সুধী সমাবেশে প্রথম আলো ট্রাস্টের উদ্যোগে গড়া পদ্মাপাড়ের (রাজশাহীর চরখিদিরপুর) ‘আলোর পাঠশালা’ নিয়ে তৈরি করা একটি প্রামাণ্যচিত্র দেখানো হয়। প্রদর্শিত হয় উচ্ছ্বাস শীর্ষক আইপিডিসির একটি প্রামাণ্যচিত্রও। শিক্ষক সম্মাননা নিয়ে নির্মিত একটি প্রামাণ্যচিত্রও প্রদর্শিত হয়।

অনুষ্ঠানে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দুই শতাধিক শিক্ষক উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে স্মৃতিচারণা করেন বগুড়া পল্লী উন্নয়ন একাডেমির মহাপরিচালক আমিনুল ইসলাম, বগুড়া সরকারি আজিজুল হক কলেজের অধ্যক্ষ শাহজাহান আলী, বগুড়ার পুলিশ সুপার আলী আশরাফ ভূঞা, কবি ও কথাসাহিত্যিক বজলুল করিম বাহার, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন স্কুল অ্যান্ড কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ শোয়েব শাহরিয়ার, পুলিশ লাইনস স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ শাহাদত আলম, সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রাবেয়া খাতুন, ‘গ্লোবাল টিচারস’ পুরস্কার পাওয়া বগুড়ার শেরপুর উপজেলার একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক শাহনাজ পারভীন প্রমুখ।

অনুষ্ঠানে স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে অনেকে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। কেউবা বলেন, প্রিয় শিক্ষকদের কারণে পাল্টে গেছে তাঁর জীবনের সমীকরণ। আলোচনায় উঠে আসে প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রিয় শিক্ষকদের কথা। বক্তারা বলেন, শিক্ষকদের ভালোবাসার সঙ্গে অন্যদের ভালোবাসার তুলনা করা অসম্ভব। জাতি গড়ার কারিগর যাঁদের বলা হয়, তাঁরা সমাজে সঠিকভাবে সম্মানিত হচ্ছেন না। শিক্ষকদের সম্মান না জানিয়ে কোনো জাতি এগোতে পারবে না।

অনুষ্ঠানে কবি ও কথাসাহিত্যিক বজলুল করিম বাহার বলেন, আইপিডিসি ও প্রথম আলো শিক্ষকদের সম্মান জানাতে যে উদ্যোগ নিয়েছে, সেটি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ ও অসাধারণ। শিক্ষকদের কাছে জাতির একটা ঋণ রয়েছে। এ রকম মহতী উদ্যোগের মাধ্যমে তাঁদের ঋণ কিছুটা হলেও শোধ করার সুযোগ রয়েছে। এই ঋণ শোধ না করতে পারলে কিসের সমাজ, কিসের রাষ্ট্র, এগুলো দিয়ে কিছু হবে না। জাতি এগোতে পারবে না। এর মাধ্যমে সংস্কৃতিচর্চার বিষয়টিও ছড়িয়ে দেওয়া দরকার। আইপিডিসি সেই কাজ করছে, প্রথম আলো সেই দায়িত্বের অংশীদার হতে চলেছে। প্রথম আলো সব সময় ভালো কাজের সঙ্গেই থাকে।

পুরস্কারপ্রাপ্ত শিক্ষক শাহানাজ পারভীন বলেন, এমন উদ্যোগ অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার। শিক্ষকেরা তো মা-বাবার মতো। তাঁরা অবশ্যই ভালো কাজের জন্য সম্মাননা পাওয়ার যোগ্য।

পুলিশ সুপার আলী আশরাফ ভূঞা স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে বলেন, ‘প্রিয় শিক্ষকের সঙ্গে অনেক আবেগ জড়িত। এটা বাস্তবতায় মিশে রয়েছে। তাঁদের সম্মাননা দেওয়া সময়ের অনিবার্য দাবি। এমন মহতী উদ্যোগ নেওয়ার জন্য প্রথম আলো ও আইপিডিসিকে শ্রদ্ধা জানাই।’